ছবিটি দেখে কেউ ধারণা করতে পারবেন এটি ঢাকা শহরের কোন এলাকা?
মুঘল আমলে ‘ খেদা ‘ নামক একটি প্রতিষ্ঠান ছিল। এর কাজ ছিল চট্টগ্রাম ও আশেপাশের অঞ্চলের বন্য হাতিদের হস্তিনী দ্বারা খেদিয়ে ঢাকায় নিয়ে আসা। এখানে এনে তাদের পোষ মানানো হতো।
পরবর্তীতে ব্রিটিশরা বাংলা অঞ্চল দখল করলে তারা এই খেদা বিভাগটি বাদ না করে এটির আরো সংস্কার করে। এই হাতিগুলোর দেখভালের জন্য ঢাকার খেদা বিভাগে একজন সুপারিন্টেন্ডেন্ট, একজন হেড এসিস্ট্যান্ট, দুইজন ভেটেরিনারি সার্জন, তিনজন ক্লার্ক, একজন পশু হিসাবকারী এবং বেশ কয়েকজন মাহুত নিযুক্ত ছিল।
হাতিগুলো ব্যবহার করা হত পাহাড়ি উপজাতিদের দমনে, উচ্চ পদের কর্তাদের যানবাহন হিসেবে, এছাড়াও গভর্নর বা বড় কোন কর্তা এলে তাদের জন্য প্যারেড করতে।
এবার বলেই দেই স্থানটির নাম। এটি ধানমন্ডি ও আজিমপুরের মাঝখানে নিউমার্কেটের পশ্চিমে ঢাকার পিলখানা এলাকা যা বর্তমানে বিজিবি সদর দপ্তর।
পিলখানা শব্দের অর্থ হাতির আস্তাবল। মজার কথা কি জানেন? আপনি যদি ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের নথি খুঁজেন পিলখানা নামক কোন স্থানের নাম পাবেন না। এই নামে কোন এলকা নেই। এটি একটি ল্যান্ডমার্ক যা লোকমুখে প্রচলিত।
আরেকটি মজার তথ্য শুনবেন? গুলিস্তানের নামও কিন্তু সিটি কর্পোরেশনের নথিতে নেই। এখানে পাকিস্তান আমলে একটি সিনেমা হল নির্মাণ করা হয় যার নাম ছিল গুলিস্তান।
গুলিস্তান ছিল ঢাকার প্রথম শীততাপ নিয়ন্ত্রিত সিনেমা হল। ধীরে ধীরে এই এলাকাটি লোকমুখে গুলিস্তান নামে পরিচিত হয়।
যাইহোক ব্রিটিশ আমলে এই শত শত হাতি আজিমপুর লালবাগ এলাকা দিয়ে শাহবাগ ও রমনা জঙ্গলে গাছ পাতা খাওয়াতে নিয়ে যাওয়া হতো। পুরান ঢাকার সীমানা ঐ এলাকা দিয়েই পথঘাট ছিল, নিউমার্কেট, শাহবাগ, রমনা ছিল জঙ্গলের এলাকা।
অনেক পরে রমনা এলাকায় জঙ্গল পরিষ্কার করে ব্রিটিশ বাবুরা বিনোদনের জন্য রেসকোর্স করেছিল। যেটা এখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নামে পরিচিত। সে এক অন্য ইতিহাস, অন্য দিনের জন্য থাক।
তো পুরান ঢাকার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হাতিদের চলাচলের কারণে পথ ঘাট ভেঙ্গে পড়ত। বাসিন্দাদের অসুবিধা হতো জনজীবনে। তারা অভিযোগ করতে থাকে ব্রিটিশ রাজের কাছে। তাদের অভিযোগ আমলে নিয়ে পরে পিলখানা থেকে রমনা পর্যন্ত হাতির চলাচলের জন্য একটি রাস্তা করা হয়। যেটি বর্তমানে এলিফ্যান্ট রোড নামে পরিচিত।
পিলখানায় যে শুধু মুঘল বা পরবর্তীতে ব্রিটিশদের হাতি থাকত এমন না। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের জমিদারেরা ও ভাওয়ালের রাজারা তাদের হাতিও পোষ মানাতে পিলখানায় পাঠাতেন।
এলিফ্যান্ট রোডের কাঁটাবন অংশে একটি জলাশয় ছিল। হাতিদের শাহবাগ ও রমনা জঙ্গল থেকে খেয়ে আসার সময় এবং প্রচণ্ড গরমের সময় এই জলাশয়ে নামিয়ে দেয়া হতো। শত শত হাতি জলকেলিতে গনগণ করা এই জলাশয় বা পুলের নাম রাখা হয়েছিল হাতিরপুল। রাজধানীর হাতিরপুল এলাকা এখনো এই নামেই পরিচিত।
একটি মজার ঘটনা দিয়ে শেষ করি। ৪৭ এ দেশ ভাগের পরে কলকাতায় চলে যাওয়া এক হিন্দু লোকের কাছ থেকে বিক্রমপুরের (বর্তমান মুন্সীগঞ্জ) একটি জমির দলিল সই করতে গেলে সেই লোক দাদাকে বলেন তার ঢাকায় পিলখানার পাশে ৫ কাঠার একটি জমি আছে। ৫০০ টাকার বিনিময়ে দাদা সেই জমি কিনে নেন।
দেশে এসে দাদা তার এক বেয়াইকে নিয়ে দেখতে যান সেই জমি। যেয়ে দেখেন সেখানে জঙ্গল আর বানরের বিরাট উৎপাত। দাদার মন খারাপ হয়ে যায়, সে ভাবে তাকে বোকা বানিয়ে গছিয়ে দিয়েছে অচল মাল।
তার বেয়াই ছিল দূরদর্শী লোক, তিনি বলেন “বেয়াই, আপনার যেহেতু পছন্দ হয় নাই, আপনি আমাকে এই জমি দিয়ে দেন, আমি আপনাকে ধীরে ধীরে পুরো ৫০০ টাকাই শোধ করে দিব। ”
আমার দাদা ৫০০ টাকা ফিরত আসায় খুশি মনে সেই জমি লিখে দিয়ে নাচতে নাচতে বিক্রমপুরে ফিরে আসেন।
পিলখানা ১৯০৪ সাল
ছবি: ফ্রিৎজ কাপ



