প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যখন দেশের ক্ষমতায় আরোহন করেন তখন বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে মারাত্মক বিপর্যস্ত। দেশের মানুষ মাত্র কিছুদিন আগে একটা দুর্ভিক্ষ পার করেছে।
জিয়া শুরুতেই আগের সরকারের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা স্থগিত করেন। বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাত আকাশচুম্বী উচ্চাভিলাষী ছিল। কিন্তু তা বাস্তবায়ন করার মতো সামর্থ্য সরকারের ছিল না।
জিয়াউর রহমান দুই বছর মেয়দী রেস্টোরেশন প্ল্যান তৈরি করলেন। তিনি স্বল্পমেয়াদী প্রজেক্টগুলো বাস্তবায়নে জোর দিলেন। দীর্ঘমেয়াদি প্ল্যানগুলো বন্ধ করে দিলেন। কারণ এতে প্রচুর অর্থ ও সময় ব্যয় হত। অ্থ সাশ্রয়ের জন্য আনপ্রোডাক্টিভ প্রজেক্টগুলো আলাদা করে সেগুলো বন্ধ করে দিয়েছেন।
আগের সরকার যে সব কলকারখানা জাতীয়করণ করেছিল, জিয়াউর রহমান সেগুলোকে ব্যক্তিমালিকানায় দিয়ে দেন। সরকারি মালিকানায় কলকারখানাগুলো দুর্নীতি এবং স্বজনপ্রীতির উৎস হয়ে উঠেছিল। অর্থনীতিকে বেসরকারি খাত নির্ভর করার পরে তিনি খাদ্য সংকট দূর করার জন্য কৃষিক্ষেত্রে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করেন। খাদ্য ও পুষ্টি খাতে বরাদ্দ বাড়ান এবং তিনি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণকে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেন।
তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোতে পাকিস্তানি শ্রমিকদের মনোপলি ছিল। জিয়াউর রহমান আরব দেশগুলোর সাথে তার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মাধ্যমে শ্রমিকদের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের বাজার দখল করেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশে রেডিমেড গার্মেন্টস শিল্প প্রতিষ্ঠা করেন। জিয়াউর রহমানের হাতে গড়ে ওঠা গার্মেন্টস এবং রেমিটেন্স এখনও বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি।
১৯৭৬ সালে জিয়াউর রহমান যখন ক্ষমতায় আসেন তখন বাংলাদেশের গ্রোথ ছিল নেগেটিভ, -১.৩%। ১৯৮১ তে যখন তিনি শহীদ হন তখন দেশের গ্রোথ ৪.৫-৫%।
জিয়ার সময়ে খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে এবং মুদ্রাস্ফীতি কমেছে। এর পেছনে মূল কারণ হচ্ছে তিনি পাবলিক সেক্টর ম্যানেজমেন্ট এ দক্ষ ছিলেন।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারলে এবং ভালো কোয়ালিটি মেইনটেইন করতে না পারলে তিনি কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতেন।
তার সময়ে প্রতিমাসে একবার বিভিন্ন প্রজেক্টের রিভিউ মিটিং হত। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবগণ এই মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করতেন। এই বিষয়ে তিনি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবদুল রাজ্জাকের ফর্মুলা অনুসরণ করেন।
আবদুল রাজ্জাক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট মনিটরিং এর জন্য একটা টিম গঠন করেছিলেন। নাম ছিল: আইসিইউ — ইমপ্লিমেন্টেশন কো-অর্ডিনেশন ইউনিট। আইসিইউ এর কাজ ছিল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ করে প্রধানমন্ত্রীকে অগ্রগতি সম্পর্কে অবগত করা।
জিয়া ১৯৭৭ সালে দুইজন কর্মকর্তাকে মালয়েশিয়া পাঠিয়েছিলেন আইসিইউ সিস্টেম সম্পর্কে স্টাডি করতে। তারা ফিরে আসার পরে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে the Implementation Monitoring and Evaluation Division (IMED) প্রতিষ্ঠা করা হয়।
রুগ্ন প্রজেক্ট হিসেবে পরিচিতি পাওয়া ২০ টি পাবলিক সেক্টর প্রজেক্ট মনিটর করার জন্য বিশটি টিম তৈরি করেছিলেন। IMED এর ডিরেক্টর এই প্রজেক্ট গুলো কো-অর্ডিনেশন করতেন। এই টিমের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তিনি মাসিক রিভিউ মিটিং এ অগ্রগতি যাচাই করতেন।
প্রেসিডেন্টের এমন কঠোর শৃঙ্খলার কারণে আমলাতন্ত্রের মনোভাব এবং আচরণ পরিবর্তন হয়ে গিয়েছিল। একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে :
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের রিভিউ মিটিং ছিল। প্রেসিডেন্ট জিয়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবকে প্রজেক্টের অগ্রগতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। ওই সচিব অত্যন্ত সিনিয়র একজন আমলা ছিলেন। তিনি তার অধস্তন কর্মকর্তাদের তৈরি করা রিপোর্ট পড়ে শোনালেন। তাদের রিপোর্ট অনুসারে প্রজেক্টের যে টার্গেট তার ৮০% বাস্তবায়ন হয়ে গেছে।
জিয়া তখন IMED এর সেক্রেটারি ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে তাদের মনিটরিং এ পাওয়া তথ্য উপস্থাপন করতে বললেন। ব্রিগেডিয়ার মজুমদার পাকিস্তান আর্মিতে জিয়ার কমান্ডিং অফিসার ছিলেন কোনো এক সময়ে। তিনি তার রিপোর্টে দেখালেন, প্রজেক্টের ইমপ্লিমেন্টেশন ৮০% নয়, বরং ২৫-৩০% সম্পন্ন হয়েছে।
দুই পক্ষের রিপোর্ট শোনার পরে দশ মিনিটের চা-বিরতি দিয়ে আবার মিটিং শুরু হল। জিয়াউর রহমান বললেন, তিনি গ্রামে ভিজিট করার সময়ে দেখেছেন স্কুলগুলো অর্ধেক কাজ হয়েছে, ভবনগুলোতে এখনও কার্যক্রম চালানো যাচ্ছে না। তার কাছে IMED র রিপোর্ট বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে।
পরেরদিন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব তার অফিসে গিয়ে দেখেন তার বাধ্যতামূলক অবসরের চিঠি তার চেয়ারের উপরে রাখা। আমলাদের মধ্যে যারা সচিবালয়কে নিজেদের জমিদারির জায়গা মনে করতেন তারা এই ঘটনার পর থেকে খুব সচেতন হয়ে গিয়েছিলেন।
পাবলিক সেক্টরের ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ব্যাপারে জিয়ার কমিটমেন্ট এর সুফল খুব দ্রুত দৃশ্যমান হয়েছিল। ১৯৭৫ সালে ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের ইমপ্লিমেন্টেশন রেট ছিল ১৭%। ১৯৮০ সালে এই রেট দাঁড়ায় ৮৬%।
নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছিল:
“Contrary to his predecessors, the general eliminated much of the politics in the civil service and began streamlining state institutions” that yielded positive outcomes.


