খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবময় পথচলা

মোহাম্মদ ফায়েক উজ্জামান

শিক্ষা কার্যক্রমের সূচনার সাল গণনা হিসেবে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় এ বছর তিন দশক পূর্ণ করল। এই তিন দশকের মধ্যে এক দশকেরও কিছু বেশি সময় আমি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত।

আমি যখন খুলনার দৌলতপুরে সরকারি বিএল কলেজের ছাত্র, তখন আশির দশকের মাঝামাঝি খুলনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন-সংগ্রাম দেখার এবং যুক্ত থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল।

১৯৯১ সালের ২৫ নভেম্বর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম যখন শুরু হয়েছিল তখন দুটি স্কুলের (অনুষদ) অধীন চারটি মাত্র ডিসিপ্লিনে (বিভাগ) শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৮০ জন।

আজ শিক্ষা কার্যক্রমের তিন দশক পূর্তির সময়ে স্কুলের সংখ্যা আটটি এবং ডিসিপ্লিনের সংখ্যা ২৯টি। শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় সাত হাজার। এ ছাড়া দুটি ইনস্টিটিউটসহ শিক্ষাসহায়ক অনেকগুলো সেন্টার ও সেল স্থাপিত হয়েছে। গত বছর থেকে চালু করা হয়েছে ইন্টারন্যাশনাল অফিস।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার শিক্ষাজীবন ও পরবর্তীকালে অধ্যাপনা পেশায় যুক্ত থাকার সময়ই খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধীত শিক্ষার বিষয় বৈচিত্র্য এবং ছাত্ররাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস আমাকে গভীর আগ্রহী করে তোলে।

বিশেষ করে সে সময়ে দেশের অন্যসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি যখন তুঙ্গে এবং নানা ঘটনায় ক্যাম্পাস উত্তাল, ছাত্রের লাশ পড়ছে, বোমা, গুলি নিত্যঘটনায় পরিণত হয়েছে, সে সময়ে দেশের অন্য একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ছাত্ররাজনীতি মুক্ত থাকা এবং সেখানকার ক্যাম্পাসের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি ছিল আমার কাছে বেশ কৌতূহলের।

বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার পীঠস্থান হিসেবে বহুমত লালন, সৃজনশীল চেতনার বিকাশ ও নতুন জ্ঞানের উন্মেষের জায়গা।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার গুণগতমান উৎকর্ষের পর্যায়ে নিয়ে যেতেও এখানকার শিক্ষক সহকর্মীবৃন্দ আমাকে নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন। এর ফলে সেন্টার অব এক্সিলেন্স ইন ট্রেনিং অ্যান্ড লার্নিং (সিইটিএল) এবং ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেল (আইকিউএসি) দেশের প্রথম পর্যায়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু হয়।

অন্যান্য অনেক প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন আইকিউএসি বা সিইটিএলের বিষয়বস্তু সম্পর্কে শিক্ষকদের অনেকেই খুব বেশি জানতেন না। তখন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ দুটি প্রতিষ্ঠান পুরোদমে কাজ করেছে। এর ফলে শিক্ষকদের শিখন ও শিক্ষাদানের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি শিক্ষার গুণগতমান উন্নয়নে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ সম্ভব হয়েছে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে নবীন শিক্ষকমণ্ডলী শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেই এখানে শিখন ও শিক্ষাদানের ওপর প্রশিক্ষণ পান, সিনিয়র, জুনিয়র প্রায় সব শিক্ষকই প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও অন্যান্য বিষয়ে কর্মশালায় অংশগ্রহণ বা প্রশিক্ষণ লাভ করেছেন।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষকেরও বেশি উন্নত বিশ্বের খ্যাতিসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর গবেষণা সম্পন্ন করেছেন। অধিকাংশই প্রিয় ক্যাম্পাসে তাদের সে লব্ধজ্ঞান বিতরণ করছেন।

একাডেমিক ও রিসার্চ পারফরম্যান্সের কারণে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় স্কপাস জরিপে পরপর দু’বছর দেশের মধ্যে উদ্ভাবনী ও গবেষণায় শীর্ষস্থান লাভ করেছে। বিসিএস পরীক্ষার ফলাফলে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েটরা ভালো করছেন।

এ বছর একজন শিক্ষক বিশ্বসেরা বিজ্ঞানীর তালিকায় স্থান পেয়েছেন।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে জাপানের কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়, মালয়েশিয়ার সারওয়াক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের মেকানিক্যাল বিভাগ এবং ইন্দোনেশিয়ার ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সের (এলআইপিআই) বায়োম্যাটেরিয়ালস সেন্টার এবং জার্মানির স্টুটগার্টস ইউনিভার্সিটির সঙ্গে শিক্ষা ও গবেষণা বিষয়ক সমঝোতা স্মারক রয়েছে।

যুক্তরাজ্যের লিডস ইউনিভার্সিটি ও লিভারপুল জন মুরস ইউনিভার্সিটির সাথে যৌথ গবেষণা প্রোগ্রাম বাস্তবায়নের লক্ষ্যেও সমঝোতা রয়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তঃমহাদেশীয় একটি গবেষণা প্রকল্পের বাংলাদেশ অংশে নেতৃত্ব দিচ্ছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।

আন্তর্জাতিক সংস্থা এফএও, ইউএসডিএ, বিএফডি, সিইউ, এসইউএসটির সঙ্গে রয়েছে প্রকল্প। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের তত্ত্বাবধানে সর্বপ্রথম বাংলাদেশ ফরেস্ট ইনভেন্টরি ম্যানুয়াল প্রস্তুতকরণ করা হয়েছে এবং দেশের সর্বপ্রথম সয়েল আর্কাইভ স্থাপিত হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন কর্তৃক খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড স্টাডিজ অন দ্য সুন্দরবনসকে (সিআইএসএস) ইনস্টিটিউট ফর ইন্টিগ্রেটেড স্টাডিজ অন দ্য সুন্দরবনস অ্যান্ড কোস্টাল ইকোসিস্টেম (আইআইএসএসসিই) হিসেবে রূপান্তরিত হয়েছে। বায়োকম্পোজিটস অ্যান্ড ন্যানোকম্পোজিটস বিষয়ে এবং পিএসই-এনপিএস সামিটের মতো দুটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়েছে।

উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় ওয়াটার অ্যান্ড স্যানিটেশন কোর্স অন্তর্ভুক্তির বিষয় ওয়াটার এইড ও খুবির স্থাপত্য ডিসিপ্লিনের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।

দেশে প্রথম কৃষি ফসলের বর্জ্য দিয়ে পরিবেশবান্ধব পার্টিকেল বোর্ড তৈরির পর পেটেন্ট প্রাপ্তির আবেদন করা হয়েছে। এ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রো টেকনোলজি ডিসিপ্লিন ধানের একটি নতুন জাত উদ্ভাবন করেছে।

এ বছর করোনা মহামারির কারণে তিন দশক পূর্তি ও বিশ্ববিদ্যালয় দিবস জাঁকজমকভাবে উদযাপন করা সম্ভব হচ্ছে না। আগামী ৫০ বা ১০০ বছরের প্রয়োজন ও চাহিদার নিরিখে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ক্যাম্পাস সম্প্রসারণ জরুরি হয়ে পড়েছে।

আমরা এ লক্ষ্যে ক্যাম্পাস সংলগ্ন ২০৩ একর জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাবনা তৈরি করছি। এই জমি পাওয়া গেলে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় আগামী ১০০ বছর নির্বিঘ্নে বিকাশ লাভ করতে পারবে।

নিরবচ্ছিন্নভাবে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে শিক্ষা কার্যক্রমের ৩০ বছর পূর্তি নিঃসন্দেহে দেশে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিশেষ অর্জন ও গৌরবের বিষয়।

এ সময়ে শিক্ষা-গবেষণাসহ বিভিন্ন দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে সুদৃঢ় ভিত্তি রচিত হয়েছে তা আগামী দিনের সাফল্যের সোপান বেয়ে সামনে এগিয়ে যেতে আমাদের অনুপ্রাণিত করবে।

এক দশক ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমার নিবিড় সম্পৃক্ততায় কেবল নানা অভিজ্ঞতা অর্জনে সক্ষম হয়েছি তা নয়, এটি আমার প্রাণের বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে।

নিবিড় সম্পৃক্ততার কারণেই আমি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অমিত সম্ভাবনা দেখতে পাই। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হবে- ৩০ বছর পূর্তির এই মাহেন্দ্রক্ষণে এটাই প্রত্যাশা।

মোহাম্মদ ফায়েক উজ্জামান

উপাচার্য, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

You cannot copy content of this page