বাংলাদেশে প্রযুক্তির অগ্রগতি গত দুই দশকে এক অসামান্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণের লক্ষ্য দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাত একটি বড় রূপান্তরের পথে অগ্রসর হয়েছে। মোবাইল ফোনের ব্যাপক বিস্তার, ইন্টারনেট ব্যবহারের অভূতপূর্ব বৃদ্ধি, তরুণ প্রজন্মের প্রযুক্তিনির্ভর পেশায় অংশগ্রহণ, এসব একত্রে গঠন করেছে একটি নতুন ডিজিটাল বাস্তবতা।
বাংলাদেশে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির প্রভাব
বর্তমানে বাংলাদেশে ১৮ কোটিরও বেশি মোবাইল সংযোগ রয়েছে, এবং ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৩ কোটির বেশি (সূত্র:https://btrc.gov.bd/ , ফেব্রুয়ারি ২০২৫). এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, বাংলাদেশ এখন আর প্রযুক্তির প্রান্তে নয়, বরং কেন্দ্রেই রয়েছে।
দেশব্যাপী ই-সেবা গ্রহণ বেড়েছে। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, ভূমি অফিস, শিক্ষা বোর্ডের রেজাল্ট, কর পরিশোধ, পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের মতো সেবাগুলো এখন জনগণের হাতের নাগালে অনলাইনে পৌঁছে যাচ্ছে। একইসাথে, স্বাস্থ্যখাতে E-health কার্ড, টেলিমেডিসিন, ও স্বাস্থ্য তথ্য ব্যবস্থাপনা সিস্টেম প্রযুক্তি-নির্ভর চিকিৎসা সেবার নতুন যুগের সূচনা করেছে। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৪৫টিতে নিয়মিতভাবে টেলিমেডিসিন সেবা চলছে (সূত্র: https://dghs.gov.bd/)। সরকারি সেবায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার এখন এক সাধারণ চিত্র। জাতীয় পরিচয়পত্র সংক্রান্ত কার্যক্রম, পাসপোর্ট, ভূমি রেজিস্ট্রেশন, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, শিক্ষা সনদ, কর পরিশোধ—সবই এখন অনলাইনের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। করোনাকালে এই প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রমাণ পাওয়া গেছে; সরকারি ও বেসরকারি উভয় প্রতিষ্ঠান যখন হোম অফিস বা ভার্চুয়াল মিটিংয়ের মাধ্যমে কার্যক্রম চালাতে সক্ষম হয়েছিল, তখনই বোঝা যায় কতটা প্রয়োজনীয় এই অগ্রগতি।
একইভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রযুক্তিনির্ভর ফ্রিল্যান্সিং একটি নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। বিশ্ববাজারে ফ্রিল্যান্সিং-এ বাংলাদেশের স্থান তৃতীয়। Payoneer-এর ২০২৩ সালের Global Gig Economy Index অনুযায়ী, বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সাররা বছরে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করছে (সূত্র: https://www.payoneer.com/resources/global-freelancer-income-report/ Payoneer Report)। Upwork, Fiverr, Freelancer.com এর মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে লাখো তরুণ ডিজাইন, প্রোগ্রামিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, কন্টেন্ট রাইটিং ইত্যাদি ক্ষেত্রে কাজ করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে নিবন্ধিত ফ্রিল্যান্সার সংখ্যা অনেক। র্তমানে বিশ্বের মোট ফ্রিল্যান্সারের মধ্যে ১৪ শতাংশই বাংলাদেশে (সূত্রঃ https://www.prothomalo.com/business/%E0%A6%89%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A7%8B%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%BE/ukpmxrdxsu )। এই অংশগ্রহণ শুধু অর্থনৈতিকভাবে নয়, বরং সামাজিকভাবে প্রযুক্তিকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলছে।
শিক্ষাক্ষেত্রেও প্রযুক্তির প্রভাব ব্যাপক। করোনা মহামারির সময় Zoom, Google Meet, Microsoft Teams ব্যবহার করে অনলাইন ক্লাস, ভার্চুয়াল পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম চলমান রাখা সম্ভব হয়েছে। তবে এই অগ্রগতিতে শহর-গ্রামের মধ্যে প্রযুক্তিগত ব্যবধান বেশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেখানে শহরের শিক্ষার্থীরা অনলাইন সুবিধা ভোগ করেছে, গ্রামীণ শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়েছে ডিভাইস ও সংযোগের অভাবে।
বিদ্যমান সমস্যা
প্রান্তিক পর্যায়ে ইন্টারনেটের ধীর গতি
সবকিছুর পরও প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে বাংলাদেশ বেশ কিছু বড় সমস্যার মুখোমুখি। একদিকে, শহরাঞ্চলে উচ্চগতির ইন্টারনেট ও ৪জি/৫জি সুবিধা থাকলেও গ্রামে এখনো ধীরগতি, অনিয়মিত সংযোগ এবং বিদ্যুৎ সমস্যায় ভোগে। শহরের তুলনায় গ্রামীণ এলাকায় প্রযুক্তির ব্যবহার ও প্রবেশাধিকারে রয়েছে একটি দৃশ্যমান বিভাজন। উচ্চগতির ইন্টারনেট, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর অভাবের কারণে এখনো দেশের একটি বড় অংশ প্রযুক্তির পূর্ণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একটি ইউনিয়ন পরিষদে ডিজিটাল সেবা চালু থাকলেও ইন্টারনেট সংযোগ বা কারিগরি জ্ঞানের অভাবে জনগণ তা ব্যবহার করতে পারছে না। তথ্যপ্রযুক্তির সমান বণ্টন নিশ্চিত না হলে প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন একটি অংশিক উন্নয়নে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।
নিরাপত্তা বিষয়ক প্রতিবন্ধকতা
সমস্যা শুধু অবকাঠামোগত নয়। আরও গভীরে গেলে দেখা যায়, সাইবার নিরাপত্তা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এমনকি রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও তথ্য ফাঁস, হ্যাকিং, ফিশিং, এবং ডেটা চুরির ঘটনা বেড়েছে। অনলাইন ব্যাংকিং, ই-কমার্স কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতারণার ঘটনা প্রযুক্তির প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে। একটি গুরুতর সমস্যা হলো সাইবার নিরাপত্তার দুর্বলতা। বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (BCC)-এর তথ্যানুযায়ী, শুধু ২০২৩ সালেই প্রায় ৪,৬০০টি সাইবার আক্রমণের ঘটনা রিপোর্ট করা হয়েছে (সূত্র: https://bcc.gov.bd/ )। ডেটা চুরি, ফিশিং, হ্যাকিং এখন প্রতিদিনকার ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।অনেক প্রতিষ্ঠান সাইবার সিকিউরিটির প্রতি পর্যাপ্ত গুরুত্ব দিচ্ছে না, আবার সাধারণ ব্যবহারকারীদের মধ্যে সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক জ্ঞানও সীমিত।
তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার বেহাল দশা
তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থা মিশ্র। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে আইসিটি বাধ্যতামূলক হলেও তা মূলত তাত্ত্বিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ কম, এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণও অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নয়। আবার দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্স, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মতো বিষয় পড়ানো হলেও অধিকাংশ শিক্ষার্থী স্নাতক শেষে ব্যবহারিকভাবে কাজের উপযোগী আন্তর্জাতিক মানের হাইটেক দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। ফলে, অভ্যন্তরীণ সফটওয়্যার শিল্প কিংবা স্টার্টআপ খাতে বিশ্বমানের উদ্ভাবন তুলনামূলকভাবে কম। তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা ব্যবস্থায় মানসম্পন্ন কোর্স, দক্ষ শিক্ষক এবং বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে।
প্রযুক্তি নির্ভর প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যর্থতা
সরকারি প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নেও রয়েছে প্রশাসনিক জটিলতা ও সময়ক্ষেপণ। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কিছু ভালো পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়নে রয়েছে জটিলতা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অনেক উপজেলা বা ইউনিয়নে ডিজিটাল সেন্টার চালু হলেও তদারকি, দক্ষ জনবল, এবং নিয়মিত আপডেটের অভাবে সেগুলো কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। একইভাবে, তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য যে স্টার্টআপ সহায়তা তহবিল ও উদ্যোগ নেওয়া হয়, তা প্রকৃত উদ্যোক্তাদের হাতে পৌঁছায় না, বা ব্যবস্থাপনায় জটিলতা তৈরি হয়। অনেক ডিজিটাল সেবা কাগজে কলমে চালু থাকলেও ব্যবহারকারীদের জন্য তা বোধগম্য ও কার্যকর নয়।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও সমাধানের সম্ভাব্য উপায়
তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর শিল্প যেমন সফটওয়্যার, গেম ডেভেলপমেন্ট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), মেশিন লার্নিং, বিগ ডেটা, ব্লকচেইন, ক্লাউড কম্পিউটিং ইত্যাদি খাতে বাংলাদেশে বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে।
হাইটেক পার্ক গুলো আমাদের নতুন সম্ভাবনার জায়গা
বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (Bangladesh Hi-Tech Park Authority) দেশে ৩৯টি হাইটেক পার্ক নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করেছে যার অনেকগুলো ইতোমধ্যে চালু রয়েছে (সূত্র: HTP.gov.bd)। এসব পার্ক প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের জন্য আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করছে এবং দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্য সুযোগ তৈরি করছে।
AI প্রযুক্তি আমাদের নতুন সপ্ন দেখাচ্ছে
এই বাস্তবতায় প্রযুক্তি খাতের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বিশাল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ব্লকচেইন, বিগ ডেটা, ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবটিক্স—এসব খাতে দক্ষতা বাড়াতে পারলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক প্রযুক্তি বাজারে একটি বড় অংশীদার হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কৃষিখাতে AI ব্যবহার করে ফসলের রোগ শনাক্তকরণ, আবহাওয়া পূর্বাভাস বিশ্লেষণ, কিংবা স্বয়ংক্রিয় চাষাবাদ প্রযুক্তির ব্যবহার খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে। একইভাবে স্বাস্থ্যখাতে টেলিমেডিসিন, AI নির্ভর রোগ নির্ণয় সিস্টেম, কিংবা ই-ফাইলিং ও ডিজিটাল প্রেসক্রিপশন চিকিৎসা খাতে বিপ্লব ঘটাতে পারে।
ভবিষ্যতের প্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার জন্য সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। প্রযুক্তি শিক্ষা শুধু শহরেই নয়, গ্রামাঞ্চলেও পৌঁছে দিতে হবে। সরকার ও বেসরকারি খাতে যৌথভাবে অবকাঠামো উন্নয়ন করতে হবে। জাতীয় পর্যায়ে একটি শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তবায়নে সহায়তা করার মতো পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে তরুণ উদ্যোক্তারা প্রযুক্তি খাতে বৈপ্লবিক কিছু করতে পারে
শিল্পখাতে অটোমেশন প্রযুক্তি, কৃষিক্ষেত্রে ড্রোন ও সেন্সর প্রযুক্তি, আর্থিক খাতে ফিনটেক ব্যবস্থাপনা ও ব্লকচেইন—সব মিলিয়ে প্রযুক্তির সম্ভাবনা বহুমাত্রিক। প্রযুক্তির অগ্রগতি শুধু একটি খাতের উন্নয়ন নয়, এটি একটি রূপান্তর। এটি এমন একটি পরিবর্তন যা সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনীতিকে একত্রে গড়ে তোলে। বাংলাদেশ যদি সময়োচিত উদ্যোগ নিতে পারে, তাহলে অচিরেই এই দেশ প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নের এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার বুকে।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশে প্রযুক্তির অগ্রগতি নিঃসন্দেহে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করেছে। তবে এই অগ্রগতিকে টেকসই ও সর্বজনীন করতে হলে প্রয়োজন—
প্রযুক্তি শিক্ষার বিকেন্দ্রীকরণ
গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়ন
সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা
ডিজিটাল দক্ষতায় বিনিয়োগ
স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তাদের সহায়তা
প্রযুক্তি যেন কেবল ধনী ও শহুরে জনগোষ্ঠীর জন্য নয়—বরং প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষের ক্ষমতায়নের মাধ্যম হয়, সেই লক্ষ্যে এখনই সময় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার।


