ছাত্রলীগের নিপীড়ন/ শহীদ মহিউদ্দিন মাসুম।

তখন কলেজে পড়ি।

একদিন রাত একটার দিকে আব্বার ফোন। এই সময়ে ফোন মনের ভিতরে আতংক ঢুকায়ে দেয়। কোনো দূর্ঘটনা ছাড়া তো এই সময়ে ফোন আসার কথা না। ওই ফোনটা ছিলো আতংকিত হওয়ার মতোই ফোন। ফোন ধরে বললাম—হ্যালো।
আব্বা বললেন—ঘুমাস নাই?
বললাম—না। এখনো ঘুমাইনি।
“আচ্ছা। শুন। মাসুম মারা গেছে।”

মাসুম ভাই আমাদের মামাতো ভাই। খুলু মামার বড় ছেলে। আমার নানার বাড়িতে সবচাইতে ডিসেন্ট, সবচাইতে স্নিগ্ধ ছেলেটার নাম মাসুম। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ। যখনই বাড়িতে আসতো দেখতাম হয় পেপার পড়ছে, নয়তো কোনো ম্যাগাজিন। বেশিরভাগ সময় দেখতাম Carrier নামে একটা ম্যাগাজিন পড়তো। মাসুম ভাই মারা গেছেন। আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেলো। উনি তো কোনো রকম অসুস্থ ছিলেন না।

আব্বারে বললাম—মাসুম ভাই, কেমনে মারা গেছে?
আব্বা বললেন—আমি তো এতো কিছু জানি না। মাত্র খবর পাইলাম। ষোলশহর কারা জানি ছুরি মারছে!
“এখন কোথায় আছে?”
“পাঁচলাইশ থানায়। তোর দুধু মামারে ফোন দিয়ে সকালে যাইস।”

আমি আর অপেক্ষা করলাম না। দুধু মামারে ফোন দিলাম। মামা কয়েকবার ফোন ধরলেন না। পরে ফোন ব্যাক করে বললেন—ভাইগ্না, মাসুম তো খুন হইছে। আমরা পাঁচলাইশ থানায় আছি।
আমি বললাম—আচ্ছা মামা। আমি আসতেছি।
মামা বললেন—আয়।

আমি তখন থাকি বহদ্দারহাট, চেয়ারম্যান ঘাটা। বাসা থেকে বের হয়ে রিকশা নিলাম। পাঁচলাইশ থানায় গিয়ে দেখলাম মামাতো ভাই, খালাতো ভাই, মামা, সবাই চলে আসছেন ইতোমধ্যে। দুধু মামা আর বড় মামা ওসির রুমে। বাকিরা সবাই রুমের বাইরে দাঁড়ায়ে আছে। জালাল ভাইয়ারে বললাম, ঘটনা কি ভাইয়া?
জালাল ভাইয়া বললেন—ছাত্রলীগের পোলাপাইন মাসুমরে ষোলশহর স্টেশনে কোপাইছে।

বিস্তারিত শুনলাম ভাইয়ার কাছে। মাসুম ভাই টিউশনি শেষ করে এসে ভার্সিটিতে ফিরার জন্যে স্টেশনে বসছেন। ট্রেনের জন্যে ওয়েট করছেন। এই সময়ে ছাত্রলীগের এক গ্রুপ এসে এলোপাতাড়ি কোপাইলো। মাসুম ভাই ওইখানেই শহীদ হয়ে গেলেন। স্টেশনের লোকজন উনারে হাসপাতালে নেওয়ার পর দেখে অলরেডি উনি মারা গেছেন। পরে থানায় আনা হইছে উনাকে। থানার একপাশে একটা স্ট্রেচারে শোয়ায় রাখা হইছে। একটা সাদা চাদর উপরে দেওয়া। ওই চাদরটা রক্তে ভেসে গেছে। চাদর উল্টায়া চেহারাটা একবার দেখলাম। কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে এই চেহারাটা দেখা সম্ভব না। ঠোঁটের ডানপাশের একটা অংশ দাঁতসহ ঝুলে গেছে। আর সারা শরীরে সব কোপের দাগ। গলা জবাই করা। আমি ছিটকে দূরে সরে আসলাম। এই লাশ দেখা সম্ভব না।

আমরা সবাই সারারাত থানায় দাঁড়ায়ে দাঁড়ায়ে কাটায়া দিলাম। সকালে লাশ নেওয়া হলো চট্টগ্রাম মেডিকেলে। পোস্টমর্টেম হলো। তারপর লাশ নিয়ে আমরা রওয়ানা দিলাম গ্রামের উদ্দেশ্যে। আমার মামীকে এই লাশ দেখতে দিইনি আমরা। দেখানো অবস্থা ছিলো না। আমার মামী গড়াগড়ি দিয়ে শুধু বলছেন—আমার সোনারে আমি একটু দেখি। আমার সোনারে আমি একটু দেখি। মুরব্বীরা উনারে উনার সোনারে দেখানোর সাহস পাননি। আমি নিজে মামীরে ধরে দাঁড়ায়ে ছিলাম।

ওইদিন আমি জীবনে প্রথম লাশ গোসল করানোর কাজ করলাম। লাশের বর্ণনা এই এত বছর পরেও আমি দিবো না। দেওয়া সম্ভব না। ওইদিনের পরে আমি অনেকদিন আর রাতে একা ঘুমাতে পারতাম না। ভয় পেতাম। ওইদিনের পর থেকে আমি আর কোনোদিন ছাত্রলীগরে মানুষের সন্তান মনে করতাম না। আজকেও করি না।

শহীদ মহিউদ্দিন মাসুম। আমার আপন মামাতো ভাই। আমার মামা-মামী কোনোদিন এই খুনের বিচার পর্যন্ত চাইতে পারেনি।

আজকে ছাত্রলীগ নিষিদ্ধের এই রাতে চোখের সামনে শুধু মাসুম ভাইয়ের লাশের ছবি ভাসছে। উরুসন্ধিসহ সারা শরীতে কোপের দাগ। ঠোঁটের একটা অংশ ছিড়ে ঝুলে গেছে। গলাটা জবাই করা! আহারে আমার মাসুম ভাই!

শহীদ মহিউদ্দিন মাসুম। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

You cannot copy content of this page